স্কুলের স্মৃতিকথা


সিরোইল সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের ২০২১ ব্যাচের শিক্ষার্থীবৃন্দ

আজ ০৯ নভেম্বের ২০২১,গতকাল স্কুল থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে বিদায় দিল। গতকালকের দিনটা যত না তাৎপর্যপূর্ণ ছিল তার চেয়ে হাজার হাজার গুন তাৎপর্যপূর্ণ আমাদের সিরোইলে কাটানো ৮টা বছর। আজকের লেখাটা আমার পুরো  স্কুলজীবন কেন্দ্রিক।   

এত বড় লেখা কেউ পড়বে না, তাও নিজের তৃপ্তির জন্য লিখছি। প্রত্যেক বছর ফেসবুক রিমাইন্ডার দিবে, নিজে পড়ব। নস্টালজিক হওয়া যাবে। লেখাটা  আমার কোনো শিক্ষক পড়ে থাকলে মাফ করবেন, বিশেষ করে আনোয়ার স্যার। পুরো লেখাতে হাজার খানেক বানান, ব্যাকরণ ভুল থাকতে পারে এবং এই প্রথম রচনা বাদে এতো বড় কিছু লিখছি।

আমার প্রথম স্কুল পদ্মা কিন্ডার গার্ডেন। স্কুলটাতে মাত্র কয়েকমাস পড়সিলাম, এরপর প্যারামাউন্ট স্কুল এন্ড কলেজে ভর্তি হই। আমি কোনো দিনও প্যারামাউন্ট ছেড়ে আসতে চাইনি, মূল কারণ ভালো কিছু বন্ধু পাইসিলাম। জেবিন, সুবাইতা, নাজিবা, জামিল, মাহি, তানিম এদের কথা উল্লেখ করতেই হয়। এছাড়াও শেলী ম্যামের মতো বন্ধুপ্রতিম শিক্ষকা পাইসিলাম। মোটা দাগে এদের কারো সাথেই এখন আর তেমন যোগাযোগ নাই, তবে দিন গুলা খুব সুন্দর ছিল; মনে রাখার মতো।

একপর্যায়ে আমাকে পরিবার এবং সমাজ থেকে বুঝানো হল সরকারি স্কুলে না পড়লে জীবন মূল্যহীন এবং ভালো শিক্ষার্থীরাই কেবল সরকারি স্কুলে ভর্তি হবার সুযোগ পায়। আমিও নামলাম ভর্তি যুদ্ধে, ওই সময় আমি ভালো ইংলিশ লিখতে পারলেও বাংলা লিখতে খুব কষ্ট হত, প্রায় পারতামই না বলা যায়। প্যারামাউন্টের সেশন ছিল জুন-জুলাই; জুলাই মাসে ক্লাস ওয়ানের অ্যানুয়াল এক্সাম দিয়ে সৃজন কোচিং এ ভর্তি হলাম। ঠিক সে সময় বুঝতে পারলাম যে ছাত্র হিসাবে আমি খুবই নিম্নমানের। ৬ মাস ভর্তির কোচিং করলাম, মনে হয় না একবারও ৭৫ এর বেশি পাইসিলাম। যা হবার তাই হল, কোনো স্কুলে চান্স পাইলাম না। ছোট্ট কাইফকে অনেক কথা শুনতে হলো। দূরসম্পর্কের এক খালু বলেই ফেলল “সরকারি স্কুলে পড়ার যোগ্যতা তোমার নাই”। এমন অনেক কথা শুনলাম, খারাপ লাগল। প্যারামাউন্টে আমার রেজাল্ট ভালো ছিল, ঠিক করলাম যেভাবেই হোক সরকারি স্কুলে ভর্তি হতেই হবে। বাংলার ওপর জোর দিলাম; এরপরের ১ বছর টানা সৃজন কোচিং এ প্রথম সারির শিক্ষার্থীদের মাঝে একজন ছিলাম। ওয়াজ স্যার আমাকে বাসায় পড়াত, অনেক উদ্ভাবনী পদ্ধতির মাইর খাইসি স্যারের থেকে। তখন খারাপ লাগলেও পরে বুঝসি ওই মাইর গুলা না খাইলে পড়াশুনায় ফিরে আসা সম্ভব হত না। কোচিং এর সব স্যার এবং আবার পরিবার ধরেই নিসিল আমি X নামের সরকারি স্কুলে স্কুলে চান্স পাব। পরীক্ষা দিলাম, ভালো মার্ক্স পেয়েও চান্স পেলাম সিরোইলে, ৪ টা বয়েজ সরকারি স্কুলের মাঝে সিরোইলের অবস্থান ছিল তৃতীয়। আমার পারিপার্শ্বিক মানুষজন সিরোইল স্কুল সম্পর্কে নেতিবাচক মনোভাব সে সময় আমাকে বাপকভাবে প্রভাবিত করেছিল। প্রচণ্ড খারাপ লাগসিল, সৃজন কোচিং সব চান্সপ্রাপ্ত শিক্ষার্থীদের সংবর্ধনা দিয়েছিল, এতটাই খারাপ আর লজ্জা লেগেছিল যে ওই সংবর্ধনাতে যাইনি। 

মন খারাপ করে সিরোইলে ভর্তি হলাম। আটশো কত টাকা দিয়ে যেন ভর্তি হইসিলাম। হক স্যার ভর্তি নিসিল আমার। ২ কিংবা ৩ জানুয়ারী প্রথম ক্লাস ছিল, প্রথম দিনই গেসিলাম দেরি করে, পিটি শুরু হয়ে গেসিল। এক ভাই বলল প্রনব স্যার নামের একজন আছে, পিটির পরে স্কুলে আসলে পশ্চাৎদেশের চামড়া তুলে দেন। হালকা ঢোক গিললাম, তবে আগে থেকেই মাইর খাবার অভ্যাস থাকায় বেশি ভয় লাগেনি। সেদিন ওই  ভাইয়ার পশ্চাৎদেশে প্রনব স্যারের লাঠি নাচানাচি করলেও প্রথম ক্লাস বলে স্যার আমাকে ছেড়ে দিসিল। ক্লাসে পূর্ব পরিচিত ছিল আফ্রিদি, নাহিয়ান, জাহিন, আসফাক, অলি(অলি সাথে আমার ভর্তি পরীক্ষার দিন পরিচয়, আমার পিছে বসছিল); আরো কয়েকজন ছিল, নাম মনে আসছে না। কয়েকদিনের মাঝে অলি, নাহিয়ান, রাকিব এর সাথে খুব ভালো সম্পর্ক হয়ে গেল। সবার সাথে পরিচিত হলাম, সবাইকেই ভালো লাগল। একটা সময় আমরা স্কুল যাইতাম সরকার থেকে ইস্যু করা টিফিন খাইতে আর খেলতে। ক্রিকেট, বল থ্রো এই দুইটা ছিল আমাদের ওইসময় জাতীয় খেলা। যেহেতু সিরোইলে ভর্তি হয়ে মন খারাপ ছিল, আম্মু বলল সিরোইলে ভর্তি হইসিস তো কি! এমন ভাবে পড়াশুনা করি যেন সবাই আমাকে স্কুলের নাম দিয়ে চিনে। প্রথম ২-৩ মাস একদমই পড়াশুনা করিনি, এরপর শুরু করলাম। সান-ডায়ালে ভর্তি হলাম, ভালো করে পড়া শুরু করলাম, তবে অর্ধ-বার্ষিক পরীক্ষায় ৭ম হলাম, এরপর আরেকটু জোর দিয়ে পড়ার ফলে বার্ষিকে খুব সম্ভাবত ২য় হইসিলাম। ক্লাস ৪ এ রোল হল ০৪। এর পর কোনো পরীক্ষায় ১ম হইসি, কখনো ২য়। ক্লাস ৬ পর্যন্ত আমার রোল ০২ ছিল, এই সময় ১ রোল একেক জনের হইসে কিন্তু আমার কোনো কারণে আমার রোল ২ ই থাকত। আম্মু রাগ করলে আমার ২ রোল খুবই ভালো লাগত। সান-ডায়ালে এই সময় কন্টিনিউয়াস ভালো করতাম, আমার উদ্দেশ্য সফল হইসিল। কেউ যখন জিজ্ঞাস করত কোচিং কে প্রথম কে হইসে, অন্যজন বলত "সিরোইলের কাইফ"। ওই সময়ের আমার ডোপামিনের মূল উৎস ছিল এটা। এই সময় যে আমি প্রত্যেক পরীক্ষাতেই প্রথম হইসি তা না, তবে মোস্ট অব দ্যা টাইম। 

বেশিরভাগ ভালো ছাত্ররা খানিক ইগোইস্টিক হয়, এটা দুঃখজনক হলেও সত্য। আমি ব্যক্তিগত ভাবেও এটা পছন্দ করি না। তবে আমার মাঝে এই দোষটা ছিল এবং পড়াশুনা থেকে আজ অনেক দূরে চলে গেলেও এখনও আছে। বয়েজ স্কুলে পড়ে এটা আরো প্রকট হয়েছে, তবে আমি এর জন্য অনুশোচনা বোধ করি না। একটা আদর্শ উদাহরণ হল, ক্লাস ৮ এ থাকতে X স্কুলের X মেয়ের স্টোরিতে ভুলে লাভ রিএক্ট দিয়ে দিয়েছিলাম, এরপর আনফ্রেন্ড করে ব্লক দিলাম; পরে অবশ্য মনে হয়েছে কাজটা ভূল ছিল তবে পরে আর রিকুয়েষ্টপাঠানো হয়নি।

ক্লাস ৫ এ থাকতে Y স্কুলের Y মেয়ের সাথে কিছু একটা হইছিল (আহামরি কিছু, অতিসামান্য), আমি কোচিং এর ব্যাচ ডিরেক্টরের কাছে কমপ্লেইন করি, পরে ওর ব্যাচ চেঞ্জ করে দেয়া হয় এবং খুব সম্ভবত ওর বাসায়ও বলা হইসিল। মেয়েদেরকে অপছন্দ করি কিংবা সবসময় ইগো দেখাইতাম এমন না, লজ্জা লাগত কিছুটা, এখনো লাগে। 

এসব কারণে সমকালীন ব্যাচমেট নারীসমাজে আমার নামে বেশ দুর্নাম ছিল। 


র‍্যাগ ডে, সিরোইল ২১ ব্যাচ


আমার স্কুল-কোচিং মিলায় দিন খুব ভালো যাচ্ছিল। ঠিক করেই নিসিলাম ক্লাস ১০ পর্যন্ত ২ রোল ধরে রাখব। আমার পড়াশুনায় প্রথম বাগড়া আসে ক্লাস ফাইভের শেষের দিকে। আমার কিডনীতে PUJ Obstruction ধরা পড়ে। শুনতে পাচ্ছিলাম আমার কিডনী ট্রান্সপ্লান্ট করা হবে, আব্বু ডোনারও ম্যানেজ

করছিল। কোনোমতে পিএসসি দিলাম, মনের মতো পরীক্ষা হয়নি, মন খারাপ ছিল। A+ পেলাম। তখনকার হিসেবে এটা আমার কাছে খারাপ রেজাল্ট। তবে সেইবার বৃত্তি নিয়ে দুর্নীতি হয়েছিল, প্রায় দেড় বছর পর সরকার দুর্নীতিগ্রস্থ বৃত্তিগুলো বাতিল করে আমাদের বৃত্তি দেয়, সাধারন গ্রেডে বৃত্তি পাইসিলাম। যাই হোক, আমার ডায়াগনসিস চলতে থাকল, ঢাকা গেলাম। নানা পদের, নানা রঙের, বহু সাইজের ইনজেকশন খাইলাম। পড়াশুনা তখন আমার মন নাই বলা যায়। খেলাধুলা, সাইকেল চালানো বাদ হয়ে গেল। বাসায় বসে থাকি প্রায়। ডাক্তার বলল অপারেশন করলে ভালো হয়ে যাবে, আব্বু আর সাইফুল খালু (পরিবারের মাঝে দুইজন মানুষকে আমি মন থেকে পছন্দ করি, খালু একজন) আমাকে নিয়ে চেন্নাই গেল। ওইখানে আরেকবার ডায়াগনসিস করা হল এবং অপারেশন করা হল; ডাক্তার আঙ্কেলের নাম ছিল জিমি সাদ, নাদুসনুদুস বাবুদের মতো দেখতে। আমরা রোজার ঈদের আগের দিন ব্যাক করলাম। কয়েকমাস বিছানায় পড়ে থাকলাম, স্কুলের অর্ধ-বার্ষিক পরীক্ষা দিতে পারলাম না। সিয়াম, উদয় সহ কয়েকজনের মা আমাকে দেখতে আসছিল। আন্টিদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি।


আমি বার্ষিক পরীক্ষা দিলাম প্রায় না পড়ে, রেজাল্টও ভালো হলো না। এরপরের একাডেমিক জীবনে শুধুই পতন।

অনেকটা সময় আমি বাসায় বসে ছিলাম, আউটডোর স্পোর্টস আমার পছন্দ কিন্তু সবকিছু অফ করে দিতে হল। ভালো কথা, স্কুলে তখন সবার মুখে একটাই কথা,“কাইফের বাচ্চা হবে না”। আমি ওদের রেচন অঙ্গ আর জনন অঙ্গের পার্থক্য আজও বুঝাতে পারি নাই। বাসায় বসে থাকা দেখে আব্বু কম্পিউটার কিনে দিল, ডেক্সটপ চালাইনি এর আগে, মামুন ভাইয়া তখন আমাকে অঙ্ক পড়াত, ভাইয়ার থেকে পড়ার মাঝে একটু একটু করে শিখতাম আর দিন রাত পড়ে থাকতাম পিসি নিয়ে। ওই সময়ের এহেন কোনো গেমস নাই যেটা খেলি নাই। নিউমার্কেটের এসটিআর কম্পিউটারস থেকে কয়েকশ গেমের সিডি কিনছি। একটা সময় প্রোগ্রামিং এর সাথে জড়িয়ে যাই, তামিম শাহরিয়ার সুবিনের বই থেকে সি প্রোগ্রামিং শেখা শুরু করি, এরপর পাইথন। বিভিন্ন কমপিটিশন করতাম, কমপিটিটিভ প্রোগ্রামিং ভালো লাগত খুব। এরপরে ফিজিক্স, জ্যোতির্বিজ্ঞান ও জ্যোতিঃপদার্থবিজ্ঞান, ম্যাথ অলিম্পিয়াডের সাথে জড়িয়ে যাই, তবে কোনোটাই ভালোভাবে করি নাই, জুনিয়র সায়েন্সে একবার ন্যাশনালে ক্যাম্প করার সুযোগ পেয়েছিলাম কিন্তু কোন কারণে আর যাওয়া হয়নি। অলিম্পিয়াডে বেশি সফলতা না থাকলেও বিজ্ঞানের বিশেষ করে পদার্থবিদ্যার প্রতি আমার ভালোবাসা বেড়ে যায়। পিসি আর এগুলো নিয়ে পড়াশুনা করেই সময় কাটাতাম। একটা সময় দেখা গেল স্কুলে টেক-নার্ডদের মাঝে আমি একজন। এইজন্য স্কুলের অনেক কাজ করে দিতে হইসে এবং খুব আনন্দের সাথে করতাম। স্যাররা খুব ভালোবাসত, বিশেষ করে রেজা স্যার, শাহীন স্যার, প্রণব স্যার, আনোয়ার স্যার। 

ক্লাসের অন্য ছেলেদের চেয়ে আমার আউট-নলেজ বেশি ছিল কিন্তু ছাত্র হিসেবে বেটার দ্যান এভারেজ টাইপ হয়ে গেছিলাম, যেটার জন্য আমি অনুশোচনাবোধ করি। আমি এই ৭ বছরে অনেক কিছু শিখছি, অনেক কিছু নিয়ে পড়াশুনা করা হইসে, অনেক ফিল্ড এক্সপ্লোর করছি কিন্তু আসল বিষয়টাই ইগনোর করে গেছি লাস্ট কয়টা বছর, একাডেমিক পড়াশুনা। যেটা ফিরায় আনতে আপ্রাণ চেষ্টা করব সামনের বছরগুলোতে। আমার ক্লাস ৬ এর আগের জীবন বেশি আনন্দময় ছিল, পড়াশুনা কষ্টের কিন্তু এর রেজাল্টগুলা ছিল মধুর।

সিরোইলের হয়ে শেষ কিছু বছরে আমার অর্জন বেশ কম। উল্লেখযোগ্য হিসেবে বলা যায় রাজশাহী ইউনিভার্সিটি সাইন্স ফেয়ারে চ্যাম্পিয়ন হওয়া। আমাদের টিম ৩জনের ছিল; তাহমিদুর, মাহিনুর, আমি। আইডিয়া আমার, এক্সিকিউশন তাহমিদুরের আর টাকা দিয়েছিল মাহিনুর। আমরা কেউই ভাবি নাই আমরা চ্যাম্পিয়ন হতে পারি! প্রধান কারণ ছিল আমাদের পাশে শহরের সেরা এক বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় থেকে একটা প্রোজেক্ট নিয়ে আসা হয়েছিল, যা দেখতে খুবই সুন্দর ছিল, পাশে ল্যাপটপে ওরা প্রোজেক্ট সিমুলেশান প্লে করছিল। আর আমরা প্রোজেক্ট সিমুলেশান বলে কিছু আছে সেটাই জানতাম না! তবে আমাদের প্রোজেক্ট দেখতে ভালো না হলেও কনসেপ্ট অন্যদের থেকে বেশ ভালো ছিল।

অলির বানানো র‌্যাগ-ডে এর ভিডিও, গানটাও ওই কম্পোজ করছে, লিরিক্স সম্ভাবত অনিক আর অলি মিলে লিখেছিল

এছাড়াও কিছু অলিম্পিয়াডে, সায়েন্স কম্পিটিশনে প্রাইজ পাইছি তবে সেভাবে উল্লেখ করার মত না।

আমি সিরোইলে সেরা কিছু বন্ধু পাইছিলাম। আমি, অলি, রাকিব, নাহিয়ান; একটা সময় আমাদের চার জনকে সব জায়গায় একসাথে দেখা যেত। ক্লাস ৬ এর পর থেকে কোনো কারণে রাকিবের সাথে আমাদের তিনজনের দূরত্ব বাড়ে, রাকিব নিজের সার্কেল বানায় নেয়, তবে তাও রাকিব ইজ এন্ড উইল বি আওয়ার বেস্ট ফ্রেন্ড। এর পরে আমাদের তিন জনের সার্কেল বড় হয়, অনিক আর শুভ আমাদের সার্কেলের আসে; আকাম-কুকাম এই পাঁচজন মিলে করতাম। 

অলি আমার দেখা সিরোইল'২১ ব্যাচের মাঝে সবচেয়ে ক্রিয়েটিভ, ইভেন মেইবি পুরো এসএসসি রাজশাহী '২১ ব্যাচের মাঝেও। বিশ্বাসযোগ্য মানুষ। অলি ছিল আমার সব থেকে কাছের বন্ধু।

এরপর আসে অনিক, এর একটাই সমস্যা কোনো কাজ কিভাবে গুছিয়ে করতে হয় সেটা নিয়ে কম ভাবা। খুব তাড়াহুড়া করতে চায় দিয়ে হজবরল বানায় ফেলে (আমি নিজেও খুব তাড়াহুড়া করি, রেজা স্যার আমাকে প্রায় বলত, "কাইফ হরফর করো না"), এই কারণে অনিক আমাদের থেকে লাঞ্ছনা-বঞ্চনার শিকার হত। অনিকের ক্রিয়েটিভ সেন্সও অনেক ভালো, তবে সুযোগ-সুবিধা কম পায়। অনিক খুব সুন্দর আর্ট করতে পারে, ছবি তোলাতে ঝোঁক আছে। অনিক বই পড়তে পছন্দ করে, এই জন্য অনিককে আমার বিশেষ পছন্দ। মানুষ হিসেবে অনিক অসাধারণ। আমাদের ব্যাচের একমাত্র হিন্দু অনিক, এই পূজাতে অনিকের বাচ্চা আমাকে নাড়ূ দেয়নি। 

নাহিয়ানের স্বপ্ন বিজনেস-ম্যান হওয়া। নাহিয়ান বয়সে আমার থেকে এক বছরের জুনিয়র, প্যারামাউন্টে আমার ইমিডিয়েট জুনিয়র ছিল, একসাথে সেলী ম্যামের কাছে যাইতাম।

সেভেনে থাকতে একদিন শহীদ মিনারে সবাই মিলে লাফালাফি করছিলাম, সে সময় নাহিয়ান নাদুসনুদুস ছিল; ওই ও সবার মত লাফ ঠিকই মারল কিন্তু ল্যান্ড করল কানের ওপর। সেইদিন ওর কানে তিনটা না চারটা সেলাই পড়ছিল। এরপর থেকে নাহিয়ানকে সিরোইল প্রাঙ্গণে কোনোদিন লাফালাফি করতে দেখা যায় নি। অলির মতোই নাহিয়ান ছিল আমার সব থেকে কাছের বন্ধু।

শুভ আর হাসিন আমাদের স্কুলের ব্যবসায়ী শ্রেনীর মানুষ। তারা ক্লাস ফোরে থাকতে বেবলেটের ব্যবসা করত। তাদের ক্রেতা ছিল আমাদেরই মহামান্য ব্যাচমেটগণ! শুভকে কোনো শয়তানি বুদ্ধি বললে লাভ হয়, দ্রুত রাজি করানো যায়। ক্লাস ৮ এ থাকতে একটা ঘটনা বলা যেতে পারে। বছরের শেষ ভাগ, সেইদিন সিরোইল'১৮ ব্যাচের বিদায় ছিল। কয়েকদিন আগে বৃষ্টি হয়েছিল, মাঠে কাঁদা তার ওপর ভাইয়াদের মাখা রং ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিল। আমি শুভকে বললাম, "বেটা আজকে মিশনে চ, সবগুলাকে কাদাসহ রং মাখাব। শুভ এক কথায় রাজি। অলি, নাহিয়ান, রাকিবসহ যারা ছিল সবাইকে কাদা স্নান করানো হলো। শুভ আর আমাকেও কাদা স্নান করতে হলো। সেইদিন সিরোইল স্কুল থেকে রাজশাহী শহরে রিক্সা করে কিছু কমবয়সী ভিয়েতনাম ফেরত কিশোর গেরিলা যোদ্ধাকে বাসায় ফিরতে দেখতে পাওয়া গিয়েছিল।

শুভ, আমি, হাসিন সহ আরো অনেকে মিলে স্কুলে মিলি মিলিশিয়া খেলতাম, এরজন্য নাজনীন ম্যাম আমাদের একদমই দেখতে পারত না।

রাকিব প্রথম থেকেই ব্যাচের রিচ কিড। প্রেমিক পুরুষ। তার সাবেকের সংখ্যা বর্তমান প্রায় এক ডজনের বেশি। তবে এটা বাদে রাকিব ভালো মনের মানুষ, মানুষের সাথে সাবলীল। দেখতে অসম্ভব সুন্দর। রাকিব আর আমার প্রথম সাইকেল একই ছিল। ওর সাথে উপশহরে সাইকেল চালাতাম। স্কুলের বন্ধুদের মাঝে সবার আগে আমি রাকিবের বাসায় গিয়েছিলাম, রাকিব ভুলে গেলেও আমার মনে আছে।

যারা আমার বন্ধু কম ভাই বেশি

আফ্রিদী সৃজন কোচিং এ আমার সাথে পড়ত। সুন্দর কিউট শ্রেণীর ছেলে। আমাদের পুষ্টি চাহিদা পূরণে আফ্রিদীর অবদান আছে। সে তার পুরো টিফিনটাই আমাদের দিয়ে দিত। আমরা সবাই চেটেপুটে খাইতাম। শুভ চোর অনেক সময় পুরোটাই নিজে মেরে দিত।

এখানে বলে রাখা ভালো, আমি স্কুলে প্রায় ৩ লিটার পানি নিয়ে যেতাম। আমি ছোট থেকেই বেশি পানি খাই। টিফিনের খেলে এসে দেখতাম বোতলের অর্ধেক পানি নাই, চোরের দল খেয়ে নিসে। এখন আমার ব্যাগ থেকে আর কেউ পানি চুরি করবে না, কাউকে পানি খাওয়ার জন্য দাবড়ানো হবে না।

এছাড়াও জাহিনের কথা বিশেষ করে বলতে হয়, ওর সাথে আর অনিকের সাথে অনেক সাইকেল চালাইছি। জাহিন খুব ভালো গিটার বাজাতে পারে। হেল্পফুল। জাহিন আমার কাছে ১০ টাকা পাবে। জাহিন সহজ সরল শ্রেণির মানুষ। আমাদের সার্কেলের সবচেয়ে কাছের মানুষ।

সাফাফেতের সাথে আমার মাঝে মধ্যেই মারামারি লেগে যেত, কারণ আমরা দুইজন প্রায় একই সাইজের। তবুও সাফায়েত আর আমি ক্লোজ বন্ধু ছিলাম। এছাড়াও আমি সবাইকে মেরে বেড়াতাম। এইজন্য আমার নাম হুড়ুম। হুড়ুম নামটা আমি অত্যাধিক পছন্দ করি।

মাহিনুর (চ্যাকা) তার স্যামসাং এস৯ টা আমাকে দিত, অনেক ছবি তুলছি। চ্যাকার সাথে মাঝে মধ্যেই আমার ঝামেলা লাগত, পরে আবার ঠিকও হয়ে যেত।

ইরফানের টিফিন বেস্ট ইন ক্লাস। ইরফানের টিফিনের ওপর লোভ সবার ছিল, যারা টিফিন চুরি করত না, তাদেরও ছিল। ইরফানের অপুষ্ট শরীরে পিছনে আমাদের একটি হাত থাকতেই পারে বলা যায়, খুব অল্প সময়ই ছেলে আরাম করে টিফিন খেতে পারছে!

ক্লাসের জাতীয় মামা হল মাহিন। একে কোনো কারণে আমরা কেউই মাহিন ডাকি না, মামা বলে ডাকি। এই নামের পিছনে কারণ হল মাহিন তার কথার আগে এবং পিছে মামা যুক্ত করে। মাহিনের কাছে আমি উকিপিডিয়া, কোনো কিছু জানার হলে আমাকে জিজ্ঞাস করত। খুবই বন্ধুসুলুভ, গাইল দেয়ার বিশেষ খ্যাতি আছে। স্কুলে ভর্তির সময় মামা মোটা ছিল, আমি ছিলাম চিকন। এখন সে চিকন, আমি মোটা।

রাতুলের কথাও বলতে হয়, ওই আগে বেশ মোটা ছিল। এখন পাটখড়ি। রাতুল ক্লাস ৪ তে মাঠে পিটি পরীক্ষা চলার সময় হঠাৎ অজ্ঞান হয়ে গেসিলো। পিটি পরীক্ষা হক স্যার নিচ্ছিলো, আমি ভুলভাল কমান্ড দিচ্ছিলাম। স্যার বললো পানি আনতে, রাতুলের জন্য ছাত্রবাস থেকে পানি নিয়ে আনসিলাম। পরে জ্ঞান আসছিল। 

ক্লাসে সেরা খেলোয়ার ছিল শিশির আর বিলাস। এদের দুই দলে নেয়া হত, দুই জন এক টিমে থাকলে ওই টিমের জয় সুনিশ্চিত। 

সৌরভ, জয়, অংকন ডেডিকেটেড স্কাউট ছিল। জয় খুব ভালো ড্রিল-প্যারেড করতে পারত। সৌরভ আমাদের মাঝে একমাত্র যে প্রাতিষ্ঠানিক ভাবে গান শিখছে। অংকন আবৃত্তি, লিখিত বক্তব্য খুব সুন্দর করে দিতে পারত; তার হাতের লেখাও ক্লাসে অন্যতম সেরা।

যারা ক্লাস ৯ এ আসছিল তাদের মাঝে আকিব অনিক, বান্নার সাথে আমাদের ভালো সম্পর্ক ছিল। এদের সাথে খুব অল্প সময় ক্লাস করার সুযোগ হয়েছে।

উদয়,রোহান,পরশ,রিফাত,সিয়াম প্রমুখ এরা ক্লাসের চিহ্নিত ভালো স্টুডেন্ট। ভালো ছাত্র বলে প্রায় সবাই একটু দূরত্ব বজায় রাখত; আমিও যে রাখি নাই সেটা বলা ভূল হবে। তবে একসময় পরীক্ষা এদের সাথে দিতে হত। ভালো সম্পর্ক ছিল, আছে, থাকবে। উদয়ের কাছে ক্ষমা প্রার্থী। তার বিশেষ আচরণ জন্য আমরা তাকে বিশেষ নামে ডাকতাম। যে কারোরই এই নাম শুনলে খারাপ লাগবে, তবে উদয় আমাদের নামে কোনোদিন অভিযোগ করেনি। 

অলির বানানো ট্রিবিউট ভিডিও, গান টাও ওই কম্পোজ করছে

উৎস আল্লাহর ৩৬৫টা দিন আমাদের কাছে মাইর খাইসে। আমরা সবাই মিলে উৎসকে মারতাম, উৎসও ক্যান জানি নিজ উৎসাহে মাইর খাইত বেশির ভাগ সময়। আন্টি বহুবার আমাদের বকাঝকা করেছে, তবে কে শুনে কার কথা!

এদের সাথে ক্লাসে বেশিরভাগ সময় কাটানো হইসে। এছাড়াও সবাই ছিলাম সবার ভাই। ৯৬ জনের সাথে একাধিক স্মৃতি আছে, সবার সম্পর্কে বলা সম্ভব নয়, বই হয়ে যাবে। একবার কোনো কারণে ক্লাসে বিলাশের সাথে আমার তুমুল মারামারি হয়। দুইজনেরই শার্ট ছিঁড়ে যায়। অরেকটু মারামারি হলে রক্তারক্তি হইতে পারত কিংবা সাসপেন্ড হতাম। এর কয়দিন পরেই সব স্বাভাবিক। আমাদের দেখে কেউ বলবে না কয়দিন আগে দুইজন মিলে রক্তাক্তি করছিলাম। 

৭ বছরে আমাদের ব্যাচের বড় দুইটা দুর্ঘটনা হল বল আনতে গিয়ে হেড স্যারের বাসার গেটের উপর থেকে হৃদয় এবং ফাহিমের পড়ে যাওয়া, দুইজনেরই মেজর ইনজুরি হইছিল।

পরবর্তী জীবনে হয়তো অনেক জ্ঞানী গুণী মানুষকে বন্ধু হিসাবে পাব কিন্তু সিরোইল'২১ ব্যাচের ৯৬ জন আমার সেরা বন্ধু। তারা যতই ভালো হোক, খারাপ হোক, যতই মারামরি হোক, যতই গালি দেক; মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তারা আমার বন্ধু থাকবে। 

স্কুল থেকে অগনিতবার পালানো হয়েছে। অনেকবার স্যারদের কাছে ধরা খাইসি, অনেকবার মাইর খাইসি। আমার কিডনীর সমস্যার জন্য স্যারদের কাছে ছুটির আবেদন করলে অন্যদের থেকে আমি বেশি ছুটি পাইতাম।  এই সুযোগের অসৎ ব্যবহার আমি করেছি। বহুবার এক আবেদন দিয়ে ৪-৫ জন স্কুল পালাতাম। আমি প্রথমে আবেদন মামা কে দেখায় বাইরে চলে যেতাম, দিয়ে স্কুলের অন্য পাশে গিয়ে ওই আবেদন অন্যজনকে দিতাম, এইভাবে বেশ কয়েকজন পাড় হয়ে যেত। অনেকে স্যারদের সিগনেচার নকল করত। তবে ছাত্রাবাসের দেয়াল টপকায় পালানোর আলাদা মজা আছে।

বছরের বেশির ভাগ সময়ই ক্রিকেট খেলা হতো। মাঠের পিচ ধরা নিয়ে বড় ভাইদের সাথে মাঝে মধ্যেই ঝামেলা বেধে যেত। ক্লাস ৬ এর পর দীর্ঘ সময় খেলাধুলা একদমই করতাম না। তবে স্কুলের শেষের দিনগুলোতে খেলতাম। ফুটবল খেলে কাদা মাখা শরীর নিয়ে মঠপুকুরে গোসল, এখনো চোখে ভাসছে। বর্ষার সময় ফুটবল খেলতাম সবাই। টিফিন টাইমের পরের ক্লাসে দেখা যেত রুম ভর্তি কাদা মাখা কিছু ছেলে ঘেমে বসে আছে। 

স্কুলের পোশাকের প্যান্ট ছিল আমার জন্য একটা বিভীষিকা। আগেরকার পুলিশের খাকী কাপড় দিয়ে আব্বু প্যান্ট বানায় দিত। এই প্যান্ট পরে আরামে ক্লাস করা যায় কিন্তু দৌড়ঝাঁপ করা যায় না। আমি ওই দৌড়ঝাঁপ টাই বেশি করতাম। ফলস্বরূপ আমার এই পর্যন্ত বানানো সকল প্যান্ট একাধিক বার ছিড়সে। প্যান্ট ছিড়লে ক্লাসে সমস্যা হতো না, সমস্যা হতো বাসায় আসার সময়। ওই সময় অন্য মেয়েদের স্কুল গুলাও ছুটি হতো কিনা!!

এটাই আমাদের স্কুল ড্রেস পড়া শেষ গ্রুপ ছবি

আমাদের সকল স্যার ম্যাম ছিলেন পৃথিবীর সেরা স্যার ম্যাম, পরবর্তী জীবনে যদি রিচার্ড ফাইনম্যানের মতোও কাউকে শিক্ষক হিসাবে পাই তবুও আমি এই কথাই বলব। একটা সময় স্যার-ম্যামদের পেইন লাগত। এখন বুঝছি সেটা পুরোটাই ভুল ধারণা ছিল। নাজনীন ম্যাম অন্য সবার মতো আমাদের ওপরও চিল্লাতো। ম্যাম যত চিল্লাতো আমারা তত জালাইতাম। ডি এম কামাল স্যার আমাদের সবচেয়ে কুল স্যার ছিল। স্যার পরীক্ষার ডিউটি দিতে দিতে রক আর ইডিএম গান শুনত। আমরাও তালে-বেতালে লিখতাম। স্যার গতকাল কথা বলার সময় কাঁদছিল। আনোয়ার স্যারের সাথে পাঞ্জায় কেউ পারেনি। বাংলা সম্পর্কে স্যারের জ্ঞান অগাধ। শাহীন স্যার আমার মেন্টর। স্যারের সাথে আমি সবচেয়ে বেশি ফ্রী। স্যারের হিউমার লেভেল সাংঘাতিক। মজা করা ছাড়া স্যার ক্লাস নিতে পারেন না। সবাইকে লাঠি নিয়ে তেড়ে বেড়ানোর জন্য স্যারের বিশেষ খ্যাতি আছে। ছাত্রের পর স্যারের দ্বিতীয় পছন্দের জিনিস হল স্কুলের বাগান। প্রণব স্যারকে আমারা পিটি স্যার হিসেবে জানতাম, তবে ক্লাস সিক্সে স্যার অংকের প্রশ্ন করে, যাতে ছেলেপেলে গণহারে ফেল করে। শাহীন স্যারের মতে প্রণব স্যার অংকে অসাধারণ। স্যার আমাকে বিশেষ স্নেহ করতেন, আমি এর অসৎ ব্যবহার করেছি। পিটি ক্লাসে পিটি করতাম না, কিডনীর অজুহাত দিতাম। রেজা স্যার স্কুলের সকল স্যার ম্যামদের থেকে কম্পিউটার সম্পর্কে অধিক জ্ঞান রাখেন। স্যারের কথা খুব মনে পরবে। স্যার আমাকে সবসময় বলত ধীরে সুস্থে কাজ করার জন্য; স্যারের উপদেশটা মানার আমি যথাসম্ভব চেষ্টা করব। স্কুলের কম্পিউটারে সমস্যা হলে স্যার আমাদের ডাকত। নাফিজ ভাই, আসিফ ভাই, খালিদ ভাই, সায়েম ভাই, আমি; আমরা ছিলাম স্যারের টেক স্পেশালিষ্ট। ফাতেমা ম্যাম আমার দুঃসম্পর্কের আত্মীয় হয়, তবে এই পরিচয় ম্যামকে কখনও দি নাই। ম্যাম আমাকে মুযতাবির ডাকত। আমার নেকবর স্যারকে খুব ভাল্লাগত কিন্তু স্যার পরে ল্যাবে চলে যায়। আমার দেখা সেরা প্রধান শিক্ষক হলেন রশিদ স্যার। স্যারকে দেখলে আমাদের সবার হৃদস্পন্দন দুই সেকেন্ডর জন্য বন্ধ হয়ে যেত। স্যার যেমন কড়া তেমনি ভালো মানুষ। স্কুলের অনেক উন্নতি করছিলেন। স্যার অত্যন্ত সুন্দরভাবে স্কুল পরিচালনা করেছেন। স্যার আমাদের সকলের শ্রদ্ধার পাত্র। স্যারের কথা মনে পড়লে আজও নিজের শরীরে বিশেষ করে পশ্চাৎদেশে ব্যাথা অনুভব করি। আমি আমার ব্যাচের পক্ষ থেকে শারমিন ম্যামের কাছে ক্ষমাপ্রার্থী। আমাদের অনেকে ম্যামের সাথে বেয়াদবি করেছে। মুনিরা ম্যামকে আমরা সবাই পছন্দ করতাম। ম্যাম আমাদের জীববিজ্ঞান পড়াত, ম্যামের সুবাদে আমরা কয়েকটি বায়োলজি ল্যাব করতে পেরেছিলাম। ম্যাম প্রচন্ড হেল্পফুল ছিলেন, আমাদের যথাসাধ্য সাহায্য করেছেন। ম্যামের ইচ্ছাশক্তি প্রবল ছিল। আমরা সবাই টিটু স্যারকে আজরাইলের মতো ভয় পাইতাম। স্যার খুব ধীর গতিতে মেরুদন্ড সোজা করে হাটত। দূরে থেকে দেখে মনে হতো আর্মির কোনো রাগী মেজর হেটে আসছে। স্যার অসম্ভব ভালো ইংরেজি পড়াতেন। প্রচন্ড ডিসিপ্লিন মেইনটেইন করতেন। স্যারের এক ক্লাসে ধমক দিলে ওই সারির সকল ক্লাস চুপ হয়ে যেত। স্যারের ক্লাসে আমাদেরকে  বাধ্যতামূলক শার্ট ইন করা লাগত। আমি স্যারের কাছে একবার ধমক খাইছিলাম। কারণ ছিল স্যারের প্রশ্নের উত্তের দেয়ার সময় হাত পিছে রাখছিলাম(পিটিতে আরামে যেভাবে দাড়াতে হয়)। আর যাই কই! টানা ৫ মিনিট স্যারের ধমক খাইলাম, স্যারের কথা, উত্তর দেয়ার সময় সাবধানে দাড়াতে হবে। হাত পিছে রাখা বেয়াদবি। এরপর আর কখনও উত্তর দেয়ার সময় হাত পিছে রাখি না। আমাদের রিটায়ার্ড দেওয়ান স্যারের ক্লাস আমরা খুব মজা নিয়ে করতাম। স্যার ক্লাস শুরু করতেন সমাজ দিয়ে, শেষ করতেন ইংরেজি দিয়ে। স্যার পরে প্রধান শিক্ষক হয়ে রিটায়ারমেন্টে গেছেন। স্যার সাদা মনের একজন মামুষ ছিলেন।

আমাদের ব্যাচ স্কুলে দুইটা বার্ষিকভোজ পেয়েছে। দিনগুলা সুন্দর ছিল। আমরা কয়েকজনের খাবার বণ্টনের দায়িত্ব থাকত। কিন্তু পরে দেখা যেত আমাদের খাবারই শর্ট (অবশ্য খাবার দেয়ার সময় উল্লেখযোগ্য পরিমাণ খাবার আমাদের পরিপাকতন্ত্রে পাচার হত)। সবসময়ই স্কুলের কোনো কাজে আসলে খুব ভাল্লাগত, আমারা কয়েকজন এইসব কাজ আগ্রহে সাথে করতাম।

সরকারি স্কুলে ভর্তির জন্য বাচ্চা-কাচ্চাদের নিয়ে অভিবাবকদের দৌড়ঝাঁপের আমি পূর্ণ বিপক্ষে অবস্থান করছি। এইখানে অর্থনৈতিক একটা বিষয় অবশ্যই আছে, সবাই হাজার হাজার টাকা খরচ করার সামর্থ্য রাখে না। সরকারি স্কুলগুলোতে খুব অল্প খরচে ভালো মানের শিক্ষা পাওয়া যায়। তবে স্কুল গুলো তে ভর্তির জন্য সকল শ্রেণীর মানুষের দৌড়ঝাঁপ এবং বাচ্চাদের অপর চাপ দেয়া অযৌক্তিক। 

সিরোইল সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় আমার জীবনে পাওয়া সেরা প্রাপ্তি। সিরোইলে মন খারাপ করে ভর্তি হলেও আমাকে একবারের জন্যও অনুশোচনা করতে হয়নি। আমি আমার সিরোইলকে অসম্ভব ভালোবাসি, মৃত্যুর আগে পর্যন্ত বাসব। এই স্কুলে চান্স পাবার সময় মন খারাপ হইছিল, বের হয়ে যাবার সময় তার চেয়ে লক্ষগুণ বেশি খারাপ লাগছে। একটা সময় আমি আমার স্কুলের নামের নেগেটিভ পার্সপেক্টিভ হটানোর জন্য পড়াশোনা করছি। খুবই ভালো লাগত তখন। জীবনের লক্ষ্য এখনও স্পেসিফিক ভাবে ঠিক করি নাই, তবে দেশের নোংরা রাজনীতি থেকে দূরে থেকে একজন সৎ বাংলাদেশী হতে চাই, দেশের জন্য কিছু করতে চাই। আমি এমন এক পজিশনে যেতে চাই যেন গর্বের সাথে বলতে পারি আমি সিরোইলের ছাত্র ছিলাম। স্যার-ম্যামরা যেন বলতে পারে কাইফ আমাদের ছাত্র ছিল।

আমি চাই আমাদের সবার মাঝে থেকে এমন একজন বের হয়ে আসুক যার মেধা ও জ্ঞান এই বিশ্বের এবং দেশের দরকার হবে, সেটা যেই ফিল্ডেই হোক না কেন; তখনই একজন বাবা-মা গর্বের সাথে বলবে তাদের ছেলে সিরোইলে পড়ে।

মোহাম্মাদ মুযতাবির ইসরাইল কাইফ
সিরোইল সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়, রাজশাহী
এসএসসি ব্যাচ ২০২১







মন্তব্যসমূহ